কয়েকটি এসিড নিক্ষেপের ঘটনা; এ নির্মমতার শেষ কোথায়?

মিলন আহমেদ ॥

এসিড নিক্ষেপ শব্দদ্বয় প্রচণ্ড রকমের ভীতিকর হলেও তার ভোগান্তি শুধু নারীকেই পোহাতে হয়। আর পৃথিবীর যে সমস্ত দেশে এই নির্মমতার আধিক্য লক্ষ্য করা যায় তার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম সারিতে।

এদেশে এসিড নিক্ষেপের জন্য মৃত্যুদন্ডের বিধান রয়েছে বটে তবে গত বারো বছরে আড়াই হাজার নারীর মুখ এসিডে ঝল্সে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড হয়নি। এসিড নিক্ষেপের মূল কারণ চিহ্নিত করে নারী-পুরুষের সমতাসূচক সমাজ প্রতিষ্ঠার তেমন কোনো উদ্যোগ লক্ষ্য করা না গেলেও মাঝে মাঝেই আক্রান্তদের প্রতি করুণা দেখানোর কিছু আনুষ্ঠানিকতার প্রচার দেখতে পাওয়া যায়। গতমাসে ঢাকায় সমাজসেবা অধিদপ্তরের মিলনায়তনে এসিড সারভাইভারদের পূনর্বাসন সহায়তা নিশ্চিতকরণ অনুষ্ঠানে ৪৫ জন এসিডদগ্ধ নারীর হাতে অনুদানের চেক তুলে দেওয়া হলো। সেখানে বক্তারা বলেন, এসিড নিক্ষেপকারীরা বিবেকের প্রতিবন্ধী। যারা নারীর প্রতি নিষ্ঠুরতা দেখতে পায় না তাদের উদ্দেশ্যে আমি প্রায়ই বলে থাকি কতজন পুরুষ নারীকে এসিড নিক্ষেপ করছে আর কতজন নারী পুরুষকে এসিড নিক্ষেপ করছে তার পরিসংখ্যান থেকেই সমাজে নারী-পুরুষের সম্পর্কের বিষয়ে ধারণা পাওয়া সম্ভব। এসব বলে তেমন কোনোই লাভ হয়নি কারণ যারা দেখতে পায় না, তারা আসলে দেখতেই শেখেনি। আমার বিশ্বাস একসময় তারা দেখতে শিখবেই এবং সেজন্যে আমি প্রতীক্ষা করছি। তাদের উদ্দেশ্যে আমার ক্ষুদ্র একটু প্রয়াস, তসলিমা নাসরিনের নারীর কোনো দেশ নেই নামক মুক্তচিন্তার ব্লগে প্রকাশিত কয়েকটি এসিড নিক্ষেপের ঘটনা বাংলায় অনুবাদ করে হুবহু প্রকাশ করলাম। যা নিম্নরূপ:-

         পুরুষরা পরিকল্পিতভাবে এসিড নিক্ষেপ করে আমাদেরকে গুরুতর আহত করছে এবং আমাদের চেহারা বিভৎস করে দিচ্ছে। তারা এসিড নিক্ষেপ করছে আমাদের শরীরে, পুড়িয়ে দিচ্ছে আমাদের মুখমন্ডল, চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিচ্ছে আমাদের নাক, গলিয়ে দিচ্ছে আমাদের চোখ, তারপর সুখি মানুষের মতো হেঁটে চলে যাচ্ছে।

        পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ভারত, আফগানিস্তান, নেপাল, কলম্বিয়াসহ আরও কিছু দেশে এসিড আক্রান্তের ঘটনা খুবই সাধারন একটি বিষয়। যে সকল বিষয়ের প্রতিবাদ করার কারণে পুরুষরা রাগান্বিত হয়ে আমাদের উপর এসিড নিক্ষেপ করছে সেগুলো হল: যৌন হয়রানি, যৌন আক্রমণ, অগ্রহনযোগ্য বিয়ের প্রস্তাব, যৌতুকের দাবী, সম্পর্ক ছিন্নকরণ ইত্যাদি। তাছাড়া আরও যেসব কারণে তারা এসিড নিক্ষেপ করছে সেগুলো মধ্যে রয়েছে: আমাদের স্কুলে যাওয়া, ইসলামী ঘোম্টা না-পরা, ভাল আচরণ না-করা, বেশি কথা বলা, উচ্চস্বরে হাসা অথবা শুধুমাত্র মজা করার জন্য।

       ভারত:  আঠারো বছরের মেয়েটি ছিল কলেজের ছাত্রী। তিনজন প্রতিবেশি তাকে দুই বছরেরও অধিক সময় ধরে যৌন হয়রানি করে আসতেছিল এবং তারপর তারা এসিড নিক্ষেপ করলো। তার মাথা, মুখ, ঘাড়, বুক এবং পিঠের চামড়া গলে গিয়েছিল। আক্রমণের নয় বছর পর সোনালী মুখার্জির দুচোখই এখন পুরোপুরি অন্ধ হয়ে গেল এবং অনেকাংশেই  সে বোবা হয়ে গেল। তার বাবা চিকিৎসার জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করেছেন। এখন তাদের কোনো টাকা-পয়সা নেই। আক্রমণকারীরা হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়েছে, তাকে এখন হত্যার হুমকি দিচ্ছে। সে এখন সরকারের কাছে সাহায্য চায় অথবা মৃত্যুর অনুমতি চায়।

 

কলম্বিয়া:সক্রেন মীনের মুখমন্ডল, এসিড আক্রমণে সে অন্ধ হয়েছে এবং বিভৎস হয়েছে।

 কার্সটেন স্টোরমার নামক একজন জার্মান সাংবাদিক এবং চিত্রগ্রাহক বলেছেন, এসিড আক্রমণের বিভৎসতার পরিমান যা দৃশ্যমান তার চাইতে আরও অনেক বেশি। পরিবার তাকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। স্বামীরা তাদের স্ত্রীদের পরিত্যাগ করে। শিশুরা আলাদা হয়ে যায় পিতা-মাতার নিকট থেকে। আক্রান্তরা কর্মশূন্য হয়ে যায় এবং বাধ্য হয়ে ভিক্ষুকে পরিণত হয়। ভূক্তভোগীদের অনেকেই সার্বক্ষনিক সহযোগি ছাড়া একটি দিনও অতিক্রম করতে পারে না, হয়ে পড়ে পরিবারের কাছে বোঝা। তারা চিহ্নিত হয়ে পড়ে মালিকবিহীন কুকুরের মতো।

  পাকিস্তান:

ফাখরা ইউনুস আক্রান্ত হয়েছিল তাঁর স্বামী বিলাল খার দ্বারা, বিলাল খা পাঞ্জাবের আইন সভার সাবেক- এমপিএ এবং পাকিস্তানের বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ গোলাম মুস্তাফার ছেলে। তাদের বিচ্ছেদের পর সে ফাখরার মুখে এসিড নিক্ষেপ করেছে। বিলার খার একসময়ের সৎমা এবং মাই ফিউডাল লর্ডএর লেখিকা তেহমিনা দুরানী ফাখরাকে সাহায্যের চেষ্টা করেছিলেন। তিনি চিকিৎসার জন্যে তাঁকে ইটালীতে পাঠিয়েছিলেন। ৩৯টি রিকনোস্ট্রাক্টিভ সার্জারির পরও ফাখরা আত্মহত্যা করলো।

         দশ বছর আগে পারিবারিক দন্দ্বের কারণে নিকটাত্মীয়ের দ্বারা এসিডে দগ্ধ হয়েছিল শাহনাজ বিবি। প্লাষ্টিক সার্জারির অভিজ্ঞতা অর্জন তার সম্ভব হয়নি। নাজাফ সুলতানার বয়স এখন ১৬। পাঁচ বছর বয়সে নাজাফ ঘুমন্ত অবস্থায় তার পিতার দ্বারা দগ্ধ হয়েছিল। পরিবারে কোনো মেয়ে থাকুক সেটা তার পিতা চাইত না। নাজাফ অন্ধ হয়ে গিয়েছে। তিন বছর আগে একদল পুরুষ শামীম আখতার(২০)-কে অপহরণ করেছিল; তারা তাকে ধর্ষণ করার পর এসিড নিক্ষেপ করেছিল। ২৬ বছর বয়স্কা কানোয়াল কাইয়ুম এক বছর আগে এসিডে আক্রান্ত হয়েছে সেই পুরুষের দ্বারা যার বিয়ের প্রস্তাব সে প্রত্যাখান করেছিল। ঠিক বিয়ের পরপরই বাশিরান বিবি তার স্বামীর বাড়িতে দগ্ধ হলো। নাসরিন শরীফ ছিল খুব সুন্দরী একজন মেয়ে। তার বয়স যখন চৌদ্দ, তার চাচাতো ভাই এক বোতল সালফিউরিক এসিড ছুঁড়ে মেরেছিল তার মুখে। রাস্তা পারাপাররত মেয়েটি ছেলেদের বাঁশির শব্দ শুনে থেমেছিল না বিধায় তাকে এসিড নিক্ষেপ করা হয়েছিল। তার চুল পুড়ে চামড়া গলে গিয়েছিল। সে এখন অন্ধ, তার এখন কান নেই এবং কোনো গন্ধ টের পায় না।

 

বাংলাদেশ:যদি কেহ কোনো মহিলাকে অপছন্দ করে এবং আক্রমণ করতে চায় তবে সালফিউরিক এসিড সংগ্রহ করা খুবই সহজ। এসিড আক্রমণের জন্য দেশটি হয়ে উঠেছে একটি আলোচিত স্থান। ভূক্তভোগী বিভৎস চেহারার নারীরা বিবাহের জন্য অযোগ্য এবং কর্মহীন হয়ে পড়ে। সে অর্থনৈতিক এবং সামাজিকভাবে তার পরিবারের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।১২ বছর বয়সে নীলাকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বিয়েতে বাধ্য করা হয়। যখন তার বয়স ১৪ তখন তার স্বামী মুখে এসিড নিক্ষেপ করেছে। নীলার প্রতি তার স্বামীর রাগের কারণ ছিল তার পরিবারের যৌতুক দেওয়ার মতো সামর্থ্য ছিল না।

   

নেপাল:আক্রিতি রাই(২২), সে তার স্বামীর দ্বারা আক্রান্ত, যে একজন নেপালী সৈন্য।

ইরান:তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণারত ছাত্র মাজেদ মোভাহেদিকে সম্পর্কের প্রস্তাবে প্রত্যাখান করেছিল আমেনেহ বাহরামী নামক একটি মেয়ে। তারপর সে এক বোতল এসিড নিক্ষেপ করেছে মেয়েটির মুখে।

 

জাম্বিয়া:একজন পুরুষ প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে ১৩ বছর বয়সী বালিকার মুখে এসিড ছুঁড়ে দিয়েছে। মেয়েটির বড় বোন বলেছেন, এসিড আক্রান্তের ক্ষতস্থান সমূহ পরিস্কার করতে গিয়ে দেখা যায় তা কুমিরের চামড়ার মত হয়ে গিয়েছে। হাসপাতালে কিছুক্ষণ ধরে ক্ষতস্থান দিয়ে নোংরা পানি বের করা হচ্ছিল, তার চামড়া বেঁধে রাখার জন্য। আমার উপলদ্ধিতে আনতে কষ্ট হচ্ছিল যে, জিহ্বার চামড়াও কিভাবে বেঁধে রাখা হয়েছিল। একজন মেয়ে তার মুখের মধ্যে ধাক্কা দিয়ে কিছু একটা ঢুকাচ্ছিল। আমি দেখার জন্য তার মুখ খুলে যা পেলাম তা হল সম্পূর্ণ জিহ্বাটা বের হয়ে এসেছে। আমি এমনভাবে টেনে দেখলাম যেভাবে আপনারা গরুর জিহ্বা দেখে থাকেন।

মেয়েদের ঘৃণা করে এমন অপরাধীদের জন্য নাইট্রিক এসিড, সালফিউরিক এসিড, হাইড্রোক্লোরিক এসিড আজকের দিনের অস্ত্র। উক্ত এসিডসমূহ ক্রয় করা সহজ, লুকানো সহজ, বহন করা সহজ এবং নিক্ষেপ করাও সহজ। কয়েকটি এসিড আক্রমনের প্রত্যক্ষদর্শী একজন জানান, এক মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে চামড়ার নিচে থাকা হাড়গুলি বের হয়ে আসতে থাকে। যদি এসিডের পরিমান একটু বেশি হয়, হাড়গুলি নরম জেলীর মত হয়ে বের হয়ে আসতে পারে। আভ্যন্তরিন অঙ্গগুলি সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে যায়। আঙ্গুল, নাক, কান ইত্যাদি গলে যেতে পারে যেমন ঘটে গরমের দিনে চকলেটের ক্ষেত্রে।

 

ইথিওপিয়া:একুশ বছর বয়স্কা মহিলা কামিলাত মেহদির জীবন তখন থেকে চিরদিনের জন্য পুরোপুরি পাল্টে গেছে যখন একজন পুরুষ তার মুখে এসিড নিক্ষেপ করে বীরদর্পে হেঁটে গেছে। কালিমাতের ভাই ইসমাইল বলেছেন, যে লোকটি তাকে আক্রমণ করেছে সে কয়েক বছর ধরে আনাগোনা করছিল। সে তাকে সময় বেঁধে দিয়েছিল কিন্তু কামিলাত পরিবারের কারো কাছে বলেনি কারণ সবাই ভাবতে পারে তাদের মধ্যে কিছু একটা ঘটেছে। লোকটি প্রায়ই বলতো সে তাদের বিরুদ্ধে একটা অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে। বাস্তবে দেখা গেল সে যা ব্যবহার করলো তা কোনো অস্ত্র নয়, এক বোতল এসিড। সে কালিমাতের উপর তা ব্যবহার করলো এবং এক সেকেন্ডের মধ্যে তার সমগ্র জীবন ধ্বংস করে দিল।

 

ইংল্যন্ড:তার প্রেমিক ইহা করেছে। রিচার্ড রেমেস সালফিউরিক এসিড নিক্ষেপ করেছে প্যাট্রিসিয়া লেফ্রাঙ্কের উপর। তার নাক এবং চোখের পাতা গলে গেছে, এক চোখের দৃষ্টিশক্তি এবং এক কানের শ্রবণশক্তি নষ্ট হয়ে গেছে, সে আরও হারিয়েছে তার আঙ্গুল। সে মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে গেছে কারণ ক্ষয়কারী ওই পদার্থ তার হৃৎপিন্ড এবং ফুসফুসের কাছে পর্যন্ত দগ্ধ করেছে। উক্ত ভয়াবহ আক্রমণ তাকে শারীরিকভাবে এবং মানসিকভাবে তাড়া করছে তার জীবনে। কি অপরাধ ছিল তার? রিচার্ড রেমেসের সাথে সে শুধু বিবাহিত জীবনের সমাপ্তি করেছিল।

অনুবাদক-সম্পাদক ঃ মিলন আহমেদ, কলেজশিক্ষক এবং নারীবাদী কলাম্নিস্ট, ঈশ্বরদী, বাংলাদেশ। 

                               সেলফোন ঃ ০১৭১২-৪৩০৬৮১। milon.ahmed8@gmail.com

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*