তারুণ্যকে অভিবাদন

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম :ঢাকার শাহবাগে কয়েক দিন ধরে যে আন্দোলন চলছে, যা শুক্রবারের মহাসমাবেশে একটা চূড়ায় উঠে সেই চূড়াতেই রয়ে গেছে, তাকে নানা কারণেই অভূতপূর্ব বলা যায়। আরব বসন্তের মতো এরও সূত্রপাত তরুণদের হাতে, যারা ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোনের প্রযুক্তি এবং সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে দিনে দিনে এর ব্যাপ্তি বাড়াচ্ছে।

আরব বসন্ত কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর রাষ্ট্রকাঠামো এবং সমাজ সংগঠনের অন্তর্নিহিত রক্ষণশীলতা ও আবদ্ধতার জন্য এবং সংস্কৃতির গতিশীল ও অনুপ্রেরণাদায়ী উপাদানগুলোকে আন্দোলনের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যবহার না করার জন্য। শাহবাগের আন্দোলনের সঙ্গে আছে সারা দেশ এবং একাত্তরের চেতনাকে পুনরুজ্জীবিত করে রাষ্ট্রকাঠামোর একটা সংস্কার সাধনও এর উদ্দেশ্য। এটি খুব সহজ হবে না নিশ্চয় কিন্তু এ দেশের রাষ্ট্র ও সমাজকাঠামোতে মধ্যপ্রাচ্যীয় রক্ষণশীলতা অথবা আবদ্ধতা নেই। যারা এই রক্ষণশীলতা আমদানি করতে চায়, এ আন্দোলন তাদের বিরুদ্ধে। শাহবাগ আন্দোলনের ভেতরের একটি শক্তি জুগিয়েছে সংস্কৃতি, যার শিকড় ছড়ানো মাটির অনেক গভীরে। এই সংস্কৃতিকে যারা উপেক্ষা করেছে, আক্রমণ করেছে এবং এর বিনাশ চেয়েছে, আন্দোলনটা তাদের বিরুদ্ধেই। ফলে এই আন্দোলন এমন এক সমীকরণের জন্ম দিয়েছে, যা শুধু পরিষ্কারভাবে এর পক্ষ-প্রতিপক্ষ নির্ধারণ করে দিচ্ছে না বরং প্রতিপক্ষের অবস্থানে যারা আছে, তাদের অনেককে নতুন করে তাদের নিজেদের নিয়ে ভাবতে বাধ্য করছে। আমি নিশ্চিত, অনেক তরুণ, যারা মুক্তিযুদ্ধের ভুল ইতিহাস পড়ে বড় হয়েছে, মিথ্যাকে চিনেছে সত্য হিসেবে, নানা মতাদর্শ এবং অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে দেশের ইতিহাস এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধেই দাঁড়িয়ে গেছে একসময়, তারা নতুন করে চারদিকে দেখবে, ভাববে এবং অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসবে। আমার এই প্রত্যাশার কারণ শাহবাগ আন্দোলনের তারুণ্যমণ্ডিত চরিত্র। তরুণেরাই তরুণদের পথ দেখায়। এ দেশে, আরব বিশ্বে, সর্বত্র।

শাহবাগ আন্দোলন আরেকটি কারণে অভূতপূর্ব এবং তা হচ্ছে এর অরাজনৈতিক চরিত্র। কথাটি হয়তো একটু ভুল বলা হলো। কারণ, যে আন্দোলন দেশের রাষ্ট্র এবং শাসনব্যবস্থা, আদালত এবং শিক্ষার সংস্কার চায়, রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন চায়, তা শেষ বিচারে রাজনৈতিকই। তবে এই রাজনীতি আমাদের প্রথাগত, প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতি নয়, আমাদের দলীয় অপরাজনীতি নয় বরং এ রাজনীতি শুদ্ধ অর্থে দেশের এবং মানুষের কল্যাণে তরুণসমাজের জেগে ওঠা এবং জাতিকে পথ দেখানোর, তাদের অধিকার আদায় করার জন্য পথচলা। এটি শুরু হয়েছে এক বিশাল ক্ষোভ থেকে, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের চূড়ান্ত শাস্তির দাবি থেকে, কিন্তু আন্দোলনটি এখানেই থেমে থাকেনি। এর বড় সৌন্দর্য, এটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পুনরাধিষ্ঠান ঘটিয়েছে। যে জয় বাংলা স্লোগানটি কোনো দলের ছিল না, ছিল একাত্তরে সারা বাংলাদেশের, আন্দোলনকারীরা সেই স্লোগানটি আবার সারা দেশের মানুষের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে। তাদের ক্ষোভ ও ক্রোধের পেছনে আছে সামাজিক নানা অনাচার, দলীয় রাজনীতির নানা ব্যর্থতা এবং উগ্রপন্থী সহিংসতা। সেসবের অবসানও আন্দোলনটির লক্ষ্য। আমি নিশ্চিত, এই আন্দোলনের পর ছাত্ররাজনীতি নিয়ে দুটি বড় দলকে ভাবতে হবে। যে সহিংস রাজনীতি আমাদের অসংখ্য তরুণকে মানসিকভাবে (এবং অনেক ক্ষেত্রে শারীরিক) পঙ্গু করে ফেলছে, এর অবসান খুব দ্রুতই তাদের ঘটাতে হবে। কিছু বিভ্রান্ত তরুণ রাজপথে সহিংসতা করেছে, পুলিশের ওপর আক্রমণ করেছে, কিন্তু শাহবাগ আন্দোলনটি হচ্ছে আশ্চর্য রকম সুশৃঙ্খল এবং অহিংস। এই তরুণেরা প্রমাণ করেছে, একটা আদর্শ নিয়ে সংগ্রামে নামলে অহিংসতাই একটি দুর্জেয় অস্ত্র হয়ে দাঁড়াতে পারে।
শাহবাগ আন্দোলনটি অভূতপূর্ব। কারণ, এটি সংঘটিত হয়েছে অসম্ভব দ্রুততায়। এর কোনো কেন্দ্রীয় কাঠামো নেই, এর কেন্দ্রটি আছে বৃত্তের বাইরে, অগুনতি তরুণের মনে এবং মস্তিষ্কে, সাইবার অঞ্চলে, সারা দেশে ছোট-বড় নানা সমাবেশে। এই আন্দোলনের জন্য কেউ পয়সা ছড়ায়নি, প্রচারপত্র বিলি করেনি, দেয়ালে চিকা মারেনি। কিন্তু এই আন্দোলনের কথা এখন সারা দেশের মানুষের মুখে মুখে। এ জন্য এই আন্দোলনটি কেউ ছিনতাই করে নেবে, সেই আশঙ্কা নেই; কোনো দল বা ছাত্রসংগঠনও এ থেকে কোনো লাভ তুলে নিতে পারবে না। তবে আন্দোলনের উদ্দেশ্য ও দাবিগুলো যদি তারা ভালোভাবে বুঝতে পারে, যদি ধারণা এবং ধারণ করতে পারে এর ভেতরের শক্তিটি এবং সেই অনুযায়ী তাদের আচরণ পরিবর্তন করতে পারে, আন্দোলনটি যে শুদ্ধি চাইছে, সেই শুদ্ধি অর্জন করতে পারে, তাহলে অনেক সুফল তারাও নিজেদের মতো করে তুলে নিতে পারে।
শাহবাগ আন্দোলন শেষ হলে কী হবে, এ রকম প্রশ্ন অনেকে আমাকে করেন এবং এঁরা প্রায় সবাই তারুণ্যকে পেছনে ফেলে এসেছেন অনেক আগেই। আমি তাঁদের বলি, এই আন্দোলনটি প্রকৃতই অন্তহীন
এর শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই। কাল যদি আয়োজকেরা ঘোষণা দিয়ে বর্তমান পর্বটি সমাপ্ত করে দেন, আরেকটি আন্দোলন শুরু করতে তাদের লাগবে মাত্র একটি দিন। শাহবাগ তো প্রস্তুত থাকবেই, সারা দেশও প্রস্তুত থাকবে। এবং যদি আগামীর কোনো সরকার এর বিপরীতে অবস্থান নেয়, তাতেও খুব একটা পিছিয়ে যাবে না এই আন্দোলন। আমি আগেই বলেছি, এর কেন্দ্রটি বৃত্তের বাইরে। কোনো সরকারই সারা দেশে পুলিশ-র‌্যাব দিয়ে কোটি কোটি তরুণের প্রতিবাদকে স্তব্ধ করে দিতে পারে না। একদিন হয়তো দুর্নীতির বিরুদ্ধে তরুণেরা দাঁড়াবে, সহিংসতার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, সুষম শিক্ষা এবং অন্যান্য মৌলিক অধিকারের পক্ষে দাঁড়াবে। দাঁড়াবে যে, এই প্রত্যয় তো আমি গত কয়েক দিন থেকেই একটু একটু করে সঞ্চয় করছি। প্রথম দুই দিন সমাবেশে গিয়ে একটু হতাশ হয়েছি, যখন দেখেছি আমাদের অপরাজনীতির চর্চাকারীরাও কেউ এসে গেছেন আন্দোলনের মঞ্চে এবং বক্তব্যও দিচ্ছেন। কিন্তু জানতাম, তরুণেরা তাদের সৌজন্যবোধকে আর বেশি পরীক্ষায় ফেলবে না। আমি মঞ্চের ধারেকাছেও যাইনি, যেহেতু আমি এখন ২০-২২ বছরের তরুণ নই। ওই মঞ্চে ওঠার অধিকার শুধুই তাদের। আমি শুধু তাদের অভিবাদন জানাতে পারি এবং দেশের প্রতি তাদের ভালোবাসা দেখে আপ্লুত হতে পারি।
শাহবাগ আন্দোলন কিছু স্পষ্ট বার্তা পাঠিয়েছে দেশের মানুষের কাছে, ভুল পথে থাকা তরুণদের কাছে, রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে, প্রশাসন-প্রতিষ্ঠান-মিডিয়ার কাছে। এই বার্তাগুলোকে উপেক্ষা করা যায় না। এগুলো পড়তে হবে, বুঝতে হবে এবং মানতে হবে। মিডিয়া খুব তাড়াতাড়ি এগুলো পড়েছে, কারণ আমাদের মিডিয়াও বিশেষ করে সম্প্রচার মাধ্যম, তরুণদের শক্তিকে কাজে লাগাচ্ছে, তরুণেরাই বলতে গেলে এর চালিকাশক্তি। সেই তুলনায় প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক দলগুলো পিছিয়ে আছে। আমাদের সংবিধানে উল্লেখ আছে, জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস এবং অধিকারী। কিন্তু আমাদের প্রশাসন, পুলিশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এমনকি বিচারব্যবস্থায় জনগণ উপেক্ষিত। শাহবাগ আন্দোলন জানিয়ে দিয়েছে, সংস্কার প্রয়োজন, আমূল সংস্কার প্রয়োজন। এবং দেশের সব তরুণ যদি এই পরিবর্তনের সংকল্পে ঐক্যবদ্ধ হয়, তাহলে তা আজ না হোক কাল তো হবেই।
রাজনৈতিক দলগুলো হয়তো নিজেদের স্বার্থ মাথায় রেখে বুঝতে চাইবে এই আন্দোলনটিকে। কিন্তু তা হবে ভুল। আওয়ামী লীগ গত নির্বাচনে জিতেছিল তরুণদের ভোটে, কিন্তু জিতেই দলটি অনেক দূরে চলে গিয়েছিল তাদের থেকে। এরপর এর ছাত্রসংগঠনের অনেক কর্মকাণ্ড লজ্জা দিয়েছে তরুণ সমাজকেই, তাদের ক্ষুব্ধ করেছে। এখন এসব বদলাতে হবে। আগামী নির্বাচনে জিততে হলে একটা গুণগত পরিবর্তন আনতে হবে দলটির ভেতর। তরুণদের দাবিগুলো নিজেদের কাজকর্মের ভেতরে নিয়ে আসতে হবে। দুর্নীতি থেকে শুরু করে দোদুল্যমানতা
এসবের চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। পত্রপত্রিকায় লেখা হচ্ছে, শাহবাগ নিয়ে মুশকিলে পড়েছে বিএনপি। মুশকিলে আরও পড়বে দলটি, যদি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এর সংশ্লিষ্টতার ইতি না টানে। এ দলটি সুযোগ করে দিয়েছিল বাংলাদেশের বিপক্ষে যারা দাঁড়িয়েছিল একাত্তরে, তাদের গাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানোর। এবার নিজের শক্তিতে দাঁড়াতে হবে বিএনপিকে, তাকেও দুর্নীতি, প্রতিক্রিয়াশীলতা এবং ইতিহাস নিয়ে মিথ্যাচারের চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
তরুণেরা কোনো তৃতীয় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়নি, তারা কোনো বিকল্প দলও নয়। এই তরুণেরাই কিন্তু মূলধারা। কারণ, ভোটারদের সিংহভাগের প্রতিনিধি এরা। এরা গণতন্ত্র চায়, সবার অধিকার চায়, এরা সোনার বাংলা চায়। জয় বাংলা স্লোগানটি এবং বাংলাদেশের গৌরবের পতাকা নিয়ে এদের উচ্ছ্বাস প্রমাণ করে, এরা জাতির ভিত্তিভূমি হিসেবে একাত্তরকেই চায়।
আমি শাহবাগ আন্দোলনকে হয়তো একটি আতশ কাচের নিচে রেখে দেখছি, হয়তো এ জন্য অনেক বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে এটি। কিন্তু ৪০ বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে আমি খুব কাছে থেকে তরুণদের দেখেছি, জেনেছি, তাদের কথা শুনেছি। আন্দোলনটি হয়তো আমি অনেক বড় করে দেখছি, কিন্তু খুব যে ভুল করে দেখছি, তা নিশ্চয় নয়।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: কথাসাহিত্যিক। অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*